Header Ads

Header ADS

একাদশীর মাহাত্ম্য





একাদশীর মাহাত্ম্য

পদ্মপূরাণে একাদশী প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। এক সময়ে জৈমিনি ঋষি তাঁর গুরুদেব মহর্ষি ব্যাসদেবকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে গুরুদেব !

একাদশী কি?

একাদশীতে কেনো উপবাস করতে হয়?

একাদশী ব্রত করলে কি সুফল লাভ হয়? 

একাদশী ব্রত না করলেই বা কি ক্ষতি হয়?


কৃষ্ণ ভুলি যেই জীব অনাদি বহির্মুখ। 
অতএব মায়া তারে দেয় সংসারদুঃখ।।

শ্রীকৃষ্ণকে ভুলে জীব অনাদিকাল ধরে জড়া প্রকৃতির প্রতি আকৃষ্ট রয়েছে। তাই মায়া তাকে এ জড় জগতে নানা প্রকার দুঃখ প্রদান করছে। পরম করুণাময় ভগবান কৃষ্ণস্মৃতি জাগরিত করতে মায়াগ্রস্ত জীবের কল্যাণে বেদপুরাণ আদি শাস্ত্রগ্রন্থাবলী দান করেছেন। ভক্তি হচ্ছে ভগবানকে জানার ও ভগবৎ প্রীতি সাধনের একমাত্র সহজ উপায়। শাস্ত্রে যে চৌষট্রি প্রকার ভক্ত্যাঙ্গের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে একাদশী ব্রত সর্বোত্তম।


একাদশী কি? 

মহর্ষি ব্যাসদেব তখন বলতে লাগলেন- সৃষ্টির প্রারম্ভে পরমেশ্বর ভগবান এই জড় সংসারে স্থাবর জঙ্গম সৃষ্টি.. করলেন। মর্ত্যলোকবাসী মানুষদের শাসনের জন্য একটি পাপপুরুষ নির্মাণ করলেন । সেই পাপপুরুষের অঙ্গগুলি বিভিন্ন সব ভয়ংকর পাপ দিয়ে নির্মিত হল । পাপপুরুষের মাথাটি ব্রহ্মহত্যা পাপ, চক্ষুদটি মদ্যপানের পাপ, মুখ স্বর্ণ অপহরণের পাপ, দুই কর্ণ-গুরুপত্নী গমনের পাপ, দুই নাসিকা-স্ত্রীহত্যার পাপ, দুই বাহু-গোহত্যার পাপ, গ্রীবা-ধন অপহরণের পাপ, গলদেশ-ভ্রুণহত্যার পাপ, বক্ষ-পরস্ত্রী-গমনের পাপ, উদর-আত্মীয়স্বজন বধের পাপ, নাভি-শরণাগত বধের পাপ, কোমর-আত্মশ্লাঘার পাপ, দুই ঊরু- গুরুনিনদার পাপ, শিশ্ন-কন্যা বিক্রির পাপ, মলদ্বার-গুপ্তকথা প্রকাশের পাপ, দুই পা-পিতৃহত্যার পাপ, শরীরের রোম-সমস্ত উপপাতকীয় পাপ ইত্যাদি এভাবে বিভিন্ন সমস্ত পাপ দ্বারা ভয়ঙ্কর পাপপুরুষ নির্মিত হল। পাপপুরুষের ভয়ঙ্কর রূপ দর্শন করে ভগবান শ্রীবিষ্ণু মর্ত্যের মানব জাতির দুক্ষ মোচন করবার কথা চিন্তা করতে লাগলেন । একদিন ভগবান গড়ুরের পিঠে চড়ে চললেন যমালয়ে । ভগবানকে যমরাজ উপযুক্ত স্বর্ণের সিংহাসনে বসিয়ে পাদ্য অর্ঘ্য ইত্যাদি দিয়ে যথাবিধি তাঁর পূজা-অর্চনা করলেন । যমরাজের সঙ্গে কথোপকথনকালে ভগবান শুনতে পেলেন দক্ষিণ দিক থেকে অসংখ্য জীবের আর্তক্রন্দন ধ্বনি । প্রশ্ন করলেন-এ আর্তক্রন্দন কিসের ? যমরাজ বললেন, হে প্রভু, মর্ত্যের, পাপী মানুষেরা নিজ কর্মদোষে নরকযন্ত্রনা ভোগ করছে। সেই যাতনার আর্ত চীৎকার শোনা যাচ্ছে । যন্ত্রণাকাতর পাপচারী জীবদের দর্শন করে করুণাময় ভগবান চিন্তা করলেন-আমিই সমস্ত প্রজা সৃষ্টি করেছি, আমার সামনেই ওরা কর্ম দোষে দুষ্ট হয়ে নরক যন্ত্রণা ভোগ করছে । এখন আমিই এদের  সদগতির ব্যবস্থা করবো । ভগবান শ্রীহরি সেই পাপাচারীদের সামনে একাদশী তিথী রূপে এক দেবীমূর্তিতে প্রকাশিত হলেন। সেই পাপীদেরকে একাদশী ব্রত আচরণ করালেন । একাদশী ব্রতের ফলে তারা সর্বপাপ থেকে মুক্ত হয়ে তৎক্ষণাৎ বৈকুন্ঠধামে গমন করলেন ।

শ্রীব্যাসদেব বললেন, হে জৈমিনি ! শ্রীহরির প্রকাশ এই একাদশী সমস্ত সুকর্মের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং সমস্ত ব্রতের মধ্যে উত্তম ব্রত । কিছুদিন পরে ভগবানের সৃষ্ট পাপপুরুষ এসে শ্রীহরির কাছে করজোড়ে আকুল প্রার্থনা করতে লাগলেন- হে ভগবান ! আমি আপনার প্রজা । আমাকে যারা আশ্রয় করে থাকে, তাদের কর্ম অনুযায়ী তাদের দুঃখ দান করাই আমার কাজ ছিল । কিন্তু সম্প্রতি একাদশীর প্রভাবে আমি কিছুই করতে পারছি না, বরং ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছি । কেননা একাদশী ব্রতের ফলে প্রায় সব পাপাচারীরা বৈকুন্ঠের বাসিন্দা হয়ে যাচেছ। হে ভগবান, এখন আমার কি হবে ? আমি কাকে আশ্রয় করে থাকব ? একাদশীর প্রভাবে আমি যে ধীরে ধীরে ক্ষয় প্রাপ্ত হচ্ছি । কৃপা করে আমাকে আপনার এই একাদশীর ভয় থেকে রক্ষা করুন । হে কৈটভনাশন, আমি একমাত্র একাদশীর ভয়ে ভীত হয়ে পলায়ন করছি। মানুষ, পশুপাখী, কীট-পতঙ্গ, জলত-স্থল, বনপ্রান্তর, পর্বত-সমুদ্র, বৃক্ষ, নদী, স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল সর্বত্রই আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু একাদশীর প্রভাবে কোথাও নির্ভয় স্থান পাচ্ছি না দেখে আজ আপনার শরণাপন্ন হয়েছি । হে ভগবান, এখন দেখছি, আপনার সৃষ্ট অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ডের মধ্যে একাদশীই প্রাধান্য লাভ করেছে, সেইজন্য আমি কোথাও আশ্রয় পেতে পারছি না ।আপনি কৃপা করে আমাকে একটি নির্ভয় স্থান প্রদান করুন । পাপপুরুষের প্রার্থনা শুনে ভগবান শ্রীহরি বলতে লাগলেন-হে-পাপপুরুষ ! তুমি দুঃখ করো না । যখন একাদশী এই ত্রিভুবনকে পবিত্র করতে আবির্ভূত হবে, তখন তুমি অন্ন ও পঞ্চ রবিশস্য মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করবে তা হলে আমার একাদশী মূর্তি তোমাকে বধ করতে পারবে না । তাই একাদশীর দিন যদি এই পঞ্চ রবিশস্য গ্রহন করলে পাপপুরুষের এসকল পাপ আমাদের মধ্যে প্রবেশ করে ।

বছরে ছাব্বিশটি একাদশী আসে। সাধারণত বার মাসে চব্বিশটি একাদশী। এইগুলি হচ্ছে-


১. উৎপন্না একাদশী  -         ২. মোক্ষদা একাদশী 
৩. সফলা একাদশী ,  -        ৪. পুত্রদা একাদশী 
৫. ষটতিলা একাদশী -        ৬. জয় একাদশী 
৭. বিজয়া একাদশী   -        ৮. আমলকী একাদশী
৯. পাপমোচনী একাদশী -  ১০. কামদা একাদশী 
১১. বরুথিনী একাদশী    -   ১২. মোহিনী একাদশী 
১৩. অপরা একাদশী      -   ১৪. নির্জলা একাদশী 
১৫. যোগিনী একাদশী    -   ১৬. শয়ন একাদশী 
১৭. কামিকা একাদশী     -   ১৮. পবিত্রা একাদশী
১৯. অন্নদা একাদশী        -   ২০. পরিবর্তিনী বা পার্শ্ব একাদশী 
২১. ইন্দিরা একাদশী       -   ২২. পাশাঙ্কুশা একাদশী 
২৩. রমা একাদশী           -   ২৪. উত্থান একাদশী 

একাদশী কিভাবে পালন করবেন ?

১. সমর্থ পক্ষে দশমীতে একাহার, একাদশীতে নিরাহার ও দ্বাদশীতে একাহার করিবেন ।

২. সেটা করতে অসমর্থ হলে শুধুমাত্র একাদশীতে অনাহার ।

৩. যদি উহাতেও অসমর্থ হন তাহলে একাদশীর দিন কেবল পঞ্চ রবিশষ্য বর্জন করতে হবে। একাদশীতে ফল মূলাদি অনুকল্প গ্রহণের বিধান রয়েছে । সমর্থ পক্ষে রাত্রি জাগরণের বিধিও আছে । নিরন্তর কৃষ্ণভাবনায় থেকে নিরাহার থাকতে অপারগত হলে একাদশীতে কিছু সবজি, দুধ এবং ফল মূলাদি গ্রহণ করা যেতে পারে । যেমন- গোল আলু, মিষ্টি আলু ও চাল কুমড়া, পেঁপে, টমেটো, ফুলকপি ইত্যাদির সবজি ঘি অথবা বাদাম তৈল দিয়ে রান্না করে ভগবানকে উৎসর্গ করে তারপর আহার করতে পারেন । হলুদ, লবন ও মরিচ ব্যবহারর‌্য। এছাড়াও কলা, আপেল, আঙ্গুর, আনারস, আখ, আমড়া, শসা, তরমুজ, বেল, নারিকেল, মিষ্টি আলু, বাদাম ও লেবুর শরবত ইত্যাদি ভগবানকে অর্পণ করে প্রসাদ রূপে গ্রহণ করা যেতে পারে ।

একাদশীতে যে পাঁচ প্রকার রবিশস্য সম্পূর্ণ বর্জনীয়ঃ

ধান, গম, যব, ডাল, সরিষা এবং এগুলো থেকে উৎপন্ন সকল প্রকার খাদ্য । যেমনঃ

১. ধান- চাউল, মুড়ি, চিড়া, সুজি, পায়েস, খিচুড়ি, চাউলের পিঠা, খৈ ইত্যাদি ।

২. গম- আটা, ময়দা, সুজি, বেকারী রুটি বা সকল প্রকার বিস্কুট, , হরলিকস জাতীয় ইত্যাদি ।

৩. যব- ছাতু, খই, রুটি ইত্যাদি ।

৪. ডাল- মুগ, মাসকলাই, খেসারী, মশরী, ছোলা, অড়হর, ফেলন, বরবটী  ও  শিম ইত্যাদি ।

৫. সরিষা- সরিষার তৈল ইত্যাদি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বর্জনীয় ।

উপরোক্ত পঞ্চ রবিশষ্য যে কোন একটি একাদশীতে গ্রহণ করলে ব্রত নষ্ট হবে । উল্লেখ্য যারা সাত্ত্বিক আহাড়ী নন িএবং চা, বিড়ি/ সিগারেট, পান, কফি ইত্যাদি নেশা জাতীয় গ্রহণ করেন একাদশী ব্রত পালনের সময়কাল পর‌্যন্ত ঐগুলি গ্রহণ করা উচিত নয় ।

  একাদশী ব্রত করলে কি সুফল লাভ হয় ?

একাদশ িকরলে যে কেবলমাত্র নিজের জীবনের সদ্গতি হবে তা নয়, একাদশী ব্যক্তির প্রয়াত পিতা/ মাতা যদি নিজ কর্মদোষে নরকবাসীও হন, তবে সেই পুত্রই (একাদশী ব্রতকারী) পিতা মাতাকে নরক থেকে উদ্ধার করতে পারেন ।

একাদশী পারণ পদ্ধতি

পঞ্জিকাতে একাদশী পারণের জন্য যে সময় নির্ধারণ করা থাকে অবশ্যই সেই সময়ের মধ্যে পঞ্চ রবিশষ্য ভগবানকে নিবেদন করে মহাপ্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করে একাদশী ব্রত সুসম্পন্ন করতে হয় । নতুবা একাদশীর কোন ফল লাভ হয় না ।

অন্যান্য করণীয় বিষয়ঃ

    * একাদশী ব্রতের আগের দিন রাত ১২টার আগেই অন্ন ভোজন সম্পন্ন করে নিলে সর্বোত্তম ।

    * ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাঁশ ও মুখ গহব্বরে লেগে থাকা সব খাবার পরিষ্কার করে নেওয়া সর্বোত্তম ।

    * একাদশীতে সবজি কাটার সময় সতর্ক থাকতে হবে যেন রক্তপাত না ঘটে । একাদশীতে রক্তক্ষরণ            বর্জনীয় ।

    * একাদশীতে শরীরে প্রসাধনী ব্যবহার নিষিদ্ধ । তৈল (শরীরে ও মাথায়) সুগন্ধি সাবান সেম্পু ইত্যাদি             বর্জনীয় ।

    * সকল প্রকার ক্ষৌরকর্ম- সেভ করা এবং চুল ও নক কাটা নিষিদ্ধ ।

    * যারা একাদশীতে একাদশীর প্রসাদ রান্না করেন, তাদের পাঁচ ফোঁড়ন ব্যবহারে সতর্ক থাকা উচিত ।           কারণ পাঁচ ফোঁড়নে সরিষার তৈল ও তিল থাকতে পারে যা বর্জনীয় ।

একাদশী ব্রত পালনের প্রকত উদ্দেশ্য কেবল উপবাস করা নয়, নিরন্তর শ্রীভগবানের স্মরণ, মনন ও শ্যবন কীর্ত্তনের মাধ্যমে একাদশীর দিন অতিবাহিত করতে হয় । শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তদের একাদশীর দিন পঁচিশ মালা বা যতেষ্ট সময় পেলে আরও বেশী জপকরার নির্দেশ দিয়েছেন । এই দিনে ভগবান ভক্তের অল্প সেবায় অনেক অনেক বেশি খুশি হন । তাই শ্রীভগবানের প্রীতি লাভের এই মহাসুযোগটা হাতছারা করা কোন ভাবেই উচিত নয় ।

একাদশী পালনের সময় পরনিন্দা, পরিচর‌্যা, মিথ্যা ভাষণ, ক্রোধ, দুরাচারী, স্ত্রী সহবাস সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ । একাদশীতে অন্ন ভোজন করলে যেমন নিজে নরকবাসী হবে তেমনি অন্যকে অন্ন ভোজন করালেও নরকবাসী হতে হবে । কাজেই একাদশী পালন করা আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য ।

“ হরে কৃষ্ণ” মহামন্ত্র জপ করুন, সুখী হউন” - শ্রীল প্রভুপাদ ।

কোন মন্তব্য নেই

francisblack থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.